ফরাসি কবি শার্ল বদলেয়ার নন, শিল্পে প্রতীকবাদের পথিকৃৎ লালন | ইমন জুবায়ের

বাংলার বাউল ঘরানার অন্যতম সাধক লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০)। ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে লালন ৭৪ বছরের বৃদ্ধ। বাংলা ১২৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়িতে বসে বাউল গান গাইছেন । অনুমান করি এতদিনে, অর্থাৎ ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’-এই প্রতীকবহুল ধ্রুপদি গানটি রচনা করে ফেলেছেন। যে গানে প্রতীকি শব্দের বাহুল্য সত্ত্বেও আজও বাঙালির অন্তর নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে। ‘অচিন পাখি’, ‘খাঁচা’ এসব প্রতীকি শব্দের সাবলীল প্রয়োগ একদিকে যেমন গানটিতে গভীর এক মরমী দ্যেতনা সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে তেমন প্রতীকি শব্দের সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে। বস্তুত বাংলার বাউল গান তথা লালনের গান মাত্রই প্রতীক-সমৃদ্ধ। যেমন লালনের এই গানটি: এক ফুলে চার রং ধরেছে/ ও সে ভাবনগর ফুলে কি আজব শোভা করেছে/। মূল ছাড়া সে ফুলের লতা/ ডাল ছাড়া তার আছে পাতা/ এ বড় অকৈতব কথা/ কে পেত্যাবে কই কার কাছে।/ কারণ-বারির মধ্যে সে ফুল/ ভেসে বেড়ায় একূল -ওকূল/ শ্বেতবরণ এক ভ্রমর ব্যাকুল/ সেই ফুলের মধুর আশে।/ ডুবে দেখ মন দেলদরিয়ায়/ যে ফুলে নবীর জন্ম হয়/ সে ফুল তো সামান্য ফুল নয়/ লালন কয় যার মূল নাই দেশে।/
বহু বছর পর মার্কিন গবেষক ক্যারল সলোমন গানটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করছেন:

Four colors in a single flower-
How strangly beautiful
that flower makes the city of love!
The flower has a stem, but no roots;
it has leaves, but no branches.
This story is true,
but who can I tell it to?
Who would believe me?
The flower floats
from bank to bank
in the water of creation.
A white bee hankers after its honey.
O mind, dive
into the Ocean of the Heart.
It is no ordinary flower
from which the Prophet was born.
Lalan says, Its roots are not in the ground.

গানটির ইংরেজি-পাঠেও বোঝা যায় যে লালনের এ গানে প্রতীকের প্রয়োগ স্পস্ট। আসলে শুধু শিল্পে কেন-মানব সভ্যতায় প্রতীকের ব্যবহার বেশ পুরনো। সুপ্রাচীন সময়ে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রতীকের ব্যবহার ছিল। এমন কী প্রাগৈতিহাসিক কালেও, ইতিহাসবিদদের ধারণা, মানুষ প্রতীকের ব্যবহার করত। তবে সেসব প্রতীকগুলি ছিল সহজ সরল, কতকটা চিহ্নের মতোই। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের নানা প্রান্তে উত্থান ঘটেছে বহুমাত্রিক সংস্কৃতির । এর পাশাপাশি প্রতীকও হয়ে ওঠে জটিল থেকে জটিলতর । এ প্রসঙ্গে একজন ঐতিহাসিকের মন্তব্য হল: So naturally,different symbols came to mean many different things…and quite often certain symbols would have a different association depending upon the culture it was found in. যেমন প্রাচীন মিশরের সূর্য দেবতা হোরাস- এর চোখ। যে চোখ কেবল দেবতার চোখই নয়, আরও অনেক কিছু বোঝায়। তবে প্রতীকের ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হল, দুটি সভ্যতার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও অভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করেছে।
তবে শিল্পেসাহিত্যে প্রতীক একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। (লালনের অসংখ্য গানে যার সফল প্রয়োগ দেখি।) ইউরোপীয় শিল্পের ক্ষেত্রে প্রতীক কিংবা প্রতীকবাদ উনিশ শতকের মাঝামাঝি শিল্প আন্দোলনের ফসল। শিল্পসাহিত্যে বাস্তবের সরাসরি উপস্থাপন-যা শিল্পের মাধুর্য ম্লান করে দেয়- তারই বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কবিশিল্পীরা প্রতিবাদ মূখর হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার (১৮২১-১৮৬২) ঘোষনা করলেন, মানুষের ভাবনা এবং আবেগ শব্দের অর্থের বাইরেও শব্দে এবং ছন্দে প্রকাশ করা সম্ভবপর।

এ জন্য বলা হয়, In literature, symbolism is used to provide meaning to the writing beyond what is actually being described. যে কারণে বোদলেয়ার লিখলেন: There are perfumes that are fresh like children’s flesh,/ sweet like oboes, green like meadows/And others, corrupt, rich, and triumphant,/ having the expansiveness of infinite things,/ like amber, musc, benzoin, and incense,/which sing of the raptures of the soul and senses.
এভাবে প্রতীকের ব্যবহার শিল্পসাহিত্যে এনে দিল এক অতলান্তিক গভীরতা আর রহস্যময় মায়ামাধুর্য । যে প্রতীকের প্রয়োগ সূক্ষ্ম অথবা স্পষ্ট হতে পারে। An author may repeatedly use the same object to convey deeper meaning or may use variations of the same object to create an overarching mood or feeling. Symbolism is often used to support a literary theme in a subtle manner.
উনিশ শতকের প্রতীকবাদী আন্দোলন একই সঙ্গে ফ্রান্স রাশিয়া এবং বেলজিয়ামে বিস্তার লাভ করেছিল। বিশেষ করে কবিতায় ও চিত্রকলার ক্ষেত্রে এ আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। ১৮৫৭ সালে ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার-এর ‘অশুভ ফুল’ (Les Fleurs du mal) প্রকাশিত হয়। সাধারণত মনে করা হয় যে অশুভ ফুল (কিংবা অশিব পুষ্প) প্রকাশের মাধ্যমেই ইউরোপে প্রতীকবাদী আন্দোলন সূচিত হয় । পরবর্তীতে ফরাসি কবি স্তেফান মার্লামে এবং পল ভার্লেইন ১৮৬০ এবং ৭০ এর দশকে প্রতীকবাদকে এক নান্দনিক রূপ দান করেন। অন্যান্য কবি ও লেখকরাও তাদের রচনায় প্রতীকবাদের চর্চা অব্যাহত রাখেন। গ্রিক কবি Jean Moréas (১৮৫৬-১৯১০) প্রথম Symbolist শব্দটি ব্যবহার করেন। ইনি জাতে গ্রিক হলেও লিখতেন ফরাসি ভাষায়।
ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার কে প্রতীকবাদ পথিকৃৎ বলে মনে করা হয়। কিন্তু এই দাবি কতটুকু সত্য? কতটুকু ইতিহাসম্মত? কালের বিচারে প্রতীকবাদের পথিকৃৎ তো বাংলার মরমী সাধক ফকির লালন শাহ। ১৮৫০ সালে ৭৪ বছর বয়েসি লালন সাধনমার্গের চূড়ায় বিরাজ করছেন । কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়িতে বসে একের পর এক রচনা করছেন বাউল গান। যে গানগুলি প্রতীকবহুল। যেমন: বাড়ির পাশে আরশী নগর/ সেথায় এক পড়শী বসত করে/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে। কিংবা আরও গূঢ়তম প্রতীকসমৃদ্ধ গান: কি সন্ধানে যাই সেখানে আমি/ মনের মানুষ যেখানে/ আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি/ দিবারাত্রি নাই সেখানে।
ইউরোপের শিল্পআন্দোলনের ঐতিহাসিকেরা মনে করেন: The Symbolist period contributed much to the development of the abstract arts of the 20th century, and is a crucial step in understanding consecutive periods. Famous Symbolist artists include Gustave Moreau, Odilon Redon and Gustav Klimt. অর্থাৎ প্রতীকবাদী আন্দোলন কুড়ি শতকের ইউরোপে বিমূর্ত শিল্পকলাকে পথ দেখিয়েছে। তদ্রুপ লালনের প্রতীকবাদী গান জীবনানন্দ দাশ সহ তিরিশ শতকের আধুনিক বাঙালি কবি সাহিত্যিকদের অনুপ্রাণিত করেছে। উনিশ শতকের শেষার্ধে লালন বাঙালি সমাজে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৮৯৮ সালের ৩০ নভেম্বর যশোর জেলার শৈলকূপার সাব-রেজিষ্টার মৌলভী আবদুল ওয়ালী এশিয়াটিক সোসাইটির এক সাধারণ অধিবেশনে On Curious Tenets and Practices of a Certain Class of Faqirs in Bengal নামে একটি প্রবন্ধে লালন সম্বন্ধে উল্লেখ করেন।

এর আগে লালনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর অর্থাৎ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে সরলা দেবী ভারতী পত্রিকার ভাদ্র সংখ্যায় ‘লালন ফকির ও গগন’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এতে লালনের পরিচিতি সহ এগারোটি গান প্রকাশিত হয়। এরও আগেও লালনের মৃত্যুর মাত্র চৌদ্দ দিন পরে ১৮৯০ সালের ৩১ অক্টোবর মীর মোশারফ হোসের পরিচালিত পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকায় উপসম্পাদকীয়তে ‘মহাত্মা লালন ফকির’ নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। (এই তথ্যগুলি নিয়েছি আবুল আহসান চৌধুরীর ‘লালন সাঁইয়ের সন্ধানে’ বইটি থেকে) এভাবে লালন বাঙালি কবিসাহিত্যিকদের অনুপ্রাণিত/প্রভাবিত করেন।
গ্রিক কবি Jean Moréas এর কথা আগে একবার উল্লেখ করেছি। Moréas ১৮৮৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মাসে Le Symbolisme (Symbolist Manifesto) প্রকাশ করেন। এতে Moréas লেখেন: In this art, scenes from nature, human activities, and all other real world phenomena will not be described for their own sake; here, they are perceptible surfaces created to represent their esoteric affinities with the primordial Ideals. এই কথাগুলিই যেন লালন এর ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ গানটিতে প্রতিধ্বনি তুলেছে। এবং এই গানটিও লালনের মধ্যবয়েসে রচনা (অর্থাৎ ১৮৫০ এর পূর্বে) বলে অনুমান করি। ফরাসি Symbolist দর্শনের মূলকথা উপলব্দি করে এবার লালনের এই গানটি পাঠ করা যাক: (আমি এ লেখাটি তরুণ প্রজন্মের জন্য লিখছি বলে গানটির আপাত অর্থ বোঝার সুবিধার্থে বাংলা পাঠ্যের পাশাপাশি ইংরেজি পাঠ্য সংযোজন করে দিলাম।)

আমি এক দিনও না দেখিলাম তারে।
বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে।

I have not seen Him even for a day;
Near my home there is a mirror-city,
and my Neighbour dwells in it.

গেরাম -বেড়ে অগাধ পানি
ও তার নাই কিনারা, নাই তরণী পারে।

All around the village is fathomless water;
The water is boundless,
and there is no boat to take me across.

মনে বাঞ্ছা করি
দেখবো তারি
আমি কেমনে সে গাঁয় যাই রে।

I yearn to see Him,
(but) how shall I get to that hamlet?

বলব কি সেই পড়শির কথা
ও তার হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাই রে।
ও সে ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর
আবার ক্ষণেক ভাসে নীরে।

What shall I say about this Neighbour of mine?
He has no hands, no feet, no shoulders,
no head.One moment He is above the void;
The next moment He is afloat in the water.

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
আমার যম-যাতনা যেত দূরে।
আবার, সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।

If my Neighbour would but touch me,
all the pains of death would go away.
He and Lalon are here indeed,
but we remain countless miles apart.

(গানটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন Brother James)

সহজেই বোধগম্য যে লালনের ‘বাড়ির পাশে আরশিনগর’  গানটিও প্রতীক-বহুল। ‘বাড়ি’, ‘আরশিনগর’, ‘পড়শি’ এসব শব্দগুলি প্রতীক হিসেবে গানে এসেছে। Moréas -এর উক্তি আরও একবার স্মরণ করি: In this art, scenes from nature, human activities, and all other real world phenomena will not be described for their own sake; here, they are perceptible surfaces created to represent their esoteric affinities with the primordial Ideals.
আগেও একবার উল্লেখ করেছি যে বাংলার বাউল গান মাত্রই প্রতীক-সমৃদ্ধ। হাছন রাজার গানে ‘কানাই’, ‘ঘরবাড়ি’, ‘মাটির পিঞ্জিরা’, ‘মনমনিয়া’,‘পিয়ারি’, ‘শূন্যের মাঝার’ এমন সব বহু প্রতীকধর্মী শব্দের উল্লেখ রয়েছে। তবে হাছন রাজার জীবনকাল (১৮৫৪-১৯২২) হওয়ায় সুনামগঞ্জের এই সাধক লালন-এর সার্থক উত্তরসুরী।
লালনের প্রতীকসমৃদ্ধ গানগুলি উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রচিত হওয়ায় শিল্পে প্রতীকবাদের পথিকৃৎ ফরাসি কবি শার্ল বদলেয়ার নন, লালন। তবে বদলেয়ার কেবলমাত্র ইউরোপীয় শিল্পের ক্ষেত্রে প্রতীকবাদের পথিকৃৎ-এর মর্যাদা পেতে পারেন। অন্যদিকে লালন প্রতীকের মতো একটি আধুনিক আঙ্গিকের চর্চা করায় লালনকে আমরা তিরিশ দশকের বাংলা আধুনিক বিমূর্ত কবিতার পথপ্রদর্শক বলেও মনে করতে পারি।

ইমন জুবায়ের
প্রাবন্ধিক, ব্লগার, গবেষক, গীতিকার।

2017-06-03T21:04:36+00:00 Tags: , , |