লালন দর্শনে নাড়া শব্দের সার্থক ও বুৎপত্তিগত বিচার বিশ্লেষণ।

মহাত্মা লালন ফকির ও অন্যান্য ভাবগীতিকারদের ভাবগীতিতে নাড়া শব্দের প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। এ অঞ্চলে নাড়া শব্দটি অপ্রতক্য ভাষারূপে ফকির শব্দের সাথে সংযুক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রকার সমস্যার সৃষ্টি করে কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন মুসলিমদের নেড়ে। হিন্দুদের মালাউন। কারীগরদের জুলা। চাষিদের ফাটা এবং ফকির সম্প্রদায়কে নাড়ার ফকির বলে সম্বোধন করলে সকল সম্প্রদায়ই মনে কষ্ট অনুভব করেন।
এখানে মহারসিক লালন ফকির কীভাবে তার গানে নাড়া শব্দটির ব্যাখ্যাদান করেছেন তা একটু বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।

নাড়া শব্দের শাব্দিক অর্থের ক্ষেত্রে উদাহরণ স্বরূপ বলা চলে যে, একটি বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা কেটে বা ছেটে দিলে তাকে নাড়া বৃক্ষ বলে। মানুষের মাথার চুল কেটে বা ছেটে দিলে তাকে নাড়া মাথা বলে। আবার এ উপমহাদেশে রাগসঙ্গীত শিক্ষার ক্ষেত্রে ওস্তাদ বা গুরুগণ শিষ্যের ডান হাতে লাল রঙের সুতা অর্থাৎ নাড়া বেঁধে দিয়ে নিজ ঘরানায় গ্রহণের রেওয়াজটি আজও চালু আছে।
যেমন, বড়ে গোলাম আলী খাঁ (সঙ্গীতে)। বিসমিল্লা খাঁ (শানাইয়ে)। কেরামত উল্লাহ খাঁ (তবলায়)। আকবর আলী খাঁ (শরদে)। পণ্ডিত রবীশঙ্কর (সেতারে)। ভিজি যোগ (বেহালায়)। ভি বালসারা (পিয়ানোয়)। শিবপ্রসাদ চৌরাশিয়া (বংশী বাদনে)। এ সকল সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও প্রাতঃস্মরণীয় ওস্তাদগণ ঘরানা অনুযায়ী নাড়া বাঁধার রেওয়াজটি অদ্যবধি চালু রেখে গেছেন।

এছাড়া মহান আল্লাহ পাক সুরা এখলাসে নিজেকে নিরাবরন বা নাড়া বলে নিজের পরিচয় দান করেছেন। বলুন হে মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ এক, তিনি অমুখাপেক্ষি, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি, তার সমতুল্য কেউ নেই।
এছাড়া লালন ফকির তার একটি গানে বলেছেন, একজন নাড়া জগৎ জোড়া, কাজটি তাহার জগৎ ছাড়া। এ ছন্দটিতে তিনি সুরা এখলাসেরই পুনর্ধ্বনি করেছেন মাত্র।
অন্যত্র আর একটি ছন্দে তিনি বলেছেন, নাড়ার সঙ্গে হয়ে নাড়ি, পরনে পরেছি ডুরি, দেবনা আঁচির কড়ি, বেড়াবো চৈতন্যের পথে। সাধিকা যেদিন হতে নাড়ার সাথে নাড়ি অর্থাৎ নারী সাধিকা হয়ে জোড়া বেঁধেছেন সেদিন থেকে তিনি সন্তান উৎপাদন বন্ধ করে, আঁচি ঘরে যাওয়া বন্ধ রেখে আঁচির কড়ি অর্থাৎ সমস্ত রকম খরচাদির পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন তারা প্রেমের পথে নিয়োজিত হয়ে জগৎময় প্রেম বিতরণে ব্রতী হয়েছেন।

তিনি পুনরায় বলেছেন, ভবে আসতে নাড়া যেতে নাড়া দুদিন কেবল হড়া জড়া। অর্থাৎ মানব শিশু যখন মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হয় তখন সে নাড়া বা নিরাবরণ অবস্থায় থাকে এবং বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে যৌবন প্রাপ্ত হয়ে জাগতিক আমোদ আহ্লাদে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বয়ঃশেষে অথর্ব হয়ে জীবনাবসানের মধ্যদিয়ে জাগতিক সমস্ত রকম কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি ঘটিয়ে পৃথিবী ছেড়ে পরপারে যাওয়ার সময় নাড়া অর্থাৎ শূন্য হাতে দুনিয়া থেকে চলে যায়। কিছুই সাথে নিয়ে যেতে পারে না।

পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনাদৃষ্টে শুধু একটি কথাই প্রতীয়মান হয় যে, সুদক্ষ নাবিকের মতো লালন ফকির তার মহানগীতি কাব্যে যে কোনো একটি তুচ্ছাতিতুচ্ছ শব্দকে বেছে নিয়ে তার মায়াময় তুলির আঁচড়ে সুদক্ষ শিল্পীর মতো অসামান্য অনেক কিছু সৃষ্টি করে দেখাতে পারতেন। অত্র প্রবন্ধে নাড়া শব্দটির বিভিন্নার্থক ব্যবহার তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এখন থেকে ফকির সম্প্রদায়ভুক্ত সদস্যগণ নাড়া শব্দের প্রকৃত অর্থ অবগতির পরে তাদের মনে আর কোনো খেদ, বিদ্বেষ ও বিতৃষ্ণা থাকবে না বলে আমি আশা করি।

নিয়ামত আলী | শিক্ষক, গবেষক।

2017-06-03T21:04:35+00:00 Tags: |