মহাত্মা লালন ফকির, কাঙাল হরিনাথ ও তাঁর পত্রিকা “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা”

তাঁর আসল নাম হরিনাথ মজুমদার। কিন্তু প্রায় সবাই তাঁকে চেনেন কাঙাল হরিনাথ নামে। বাউল গানে নিজেকে কাঙাল বলে উপস্থাপন করতেন বলেই তাঁর এই পরিচিতি গড়ে ওঠে। বিখ্যাত বাউল সাধক লালনের শিষ্য ছিলেন তিনি। তবে কাঙাল হরিনাথ তাঁর বাউল গানের জন্য শুধু নয়- অন্য অনেক কাজের জন্য অমর হয়ে আছেন। তিনি ১৮৩৩ সালে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। আর্থিক টানাপড়েনে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু তরুণ বয়সেই অসহায় মানুষের পক্ষে কাজ শুরু করেন। সে সময় ব্রিটিশ শাসকদের নির্যাতনের শিকার গ্রাম-বাংলার গরিব-দুঃখী মানুষের কথা লিখতে থাকেন সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায়। পরে ১৮৬৩ সালে নিজেই ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। পরে পত্রিকাটি পাক্ষিক এবং তার কিছু পরে সাপ্তাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এক পয়সা মূল্যের এই পত্রিকাটিতে কাঙাল হরিনাথ অবিরাম নীলকর ও জমিদারদের নানা জুলুমের কথা প্রকাশ করতে থাকেন। পত্রিকাটি প্রকাশের সুবিধার্থে তিনি ১৮৭৩ সালে একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। কাঙাল হরিনাথের পত্রিকাটি সেই সময়ে নির্যাতিত কৃষক ও প্রজাদের পক্ষের একটি পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু সরকারের কঠোর মুদ্রণনীতি ও নানা বিরোধিতায় ১৮ বছর প্রকাশের পর ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই উনিশ শতকে গ্রামের নির্যাতিত মানুষের পক্ষে এমন একটি পত্রিকা প্রকাশের কারণে কাঙাল হরিনাথ অমর হয়ে আছেন।

 

 

মর্মস্পর্শী মৃত্যুদৃশ্যের মধ্যে দিয়ে লালন পরলোকে গমন করেছিলেন। শিষ্যপরম্পরায় অন্তত সে রকম বর্ণনাই পাওয়া যায়- শায়িত লালন কপালের চাদর সরিয়ে শিষ্যদের শেষবার দেখে নিলেন। বললেন, ‘তোমাদের আমি শেষ গান শোনাব।’ গান ধরলেন-  পার করো হে দয়াল চাঁদ আমারে ক্ষম হে অপরাধ আমার এই ভব কারাগারে… নীরবতার মধ্যেই গান থেমে গেল। কাতর কণ্ঠ তুলে তিনি কেবল উচ্চারণ করতে পারলেন- ‘আমি চললাম।’ গুটিয়ে নেওয়া চাদরের তলে চিরতরে নিথর হয়ে গেলেন মরমি সাধক। মৃত্যুদিনটি ছিল ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের পয়লা কার্তিক। জন্ম বার জানা যায়নি। বেঁচেছিলেন ১১৬ বছর। সেই হিসাবে জন্ম সাল দাঁড়ায় ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ। জীবদ্দশায় খুব বেশি প্রচার পাননি তিনি। ধর্মাধর্মের নানা ফেরে পড়ে গোপনেই চলেছে তাঁর ভজন-সাধন। প্রচলিত ধ্যানজ্ঞানের বাইরে এসে অখণ্ড মানবসমাজের কথা যাঁদের নিয়ে তিনি বলতে চেয়েছিলেন, তাঁরাও উঁচুদরের কেউ ছিলেন না। ফলে তাঁর জন্ম-বাস্তু, জাতপাত ইত্যাদি ভালো করে কিছুই জানা যায়নি। নিজেও প্রচার বৈরী ছিলেন। তা ছাড়া এমন অজপাড়াগাঁয়ে বসবাস ও কার্যকরণ ছিল যে সমকালীন লোকসমাজ কোনো দিনই তাঁর মেধাময় দিকটি খুঁজে পায়নি। রবীন্দ্রনাথের লালনপ্রীতি ও বাউলিয়ানায় শিক্ষিত সমাজ যত দিনে লালনকে সন্ধান করতে মনোযোগী হতে শুরু করল, তত দিনে আর তিনি বেঁচে নেই। বসন্তগ্রস্ত লালনকে পালক মা মতিজান জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘বাবা, তোমার নাম কী?’ অচেনা যুবক উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ফকির লালন।’ জীবনভর বহুবারই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। কিন্তু উত্তর একটাই- ফকির লালন। জাত-জন্মের ব্যাপারে বরাবর অভিন্ন থেকেছেন তিনি-  সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে লালন কয় জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে প্রকৃতপক্ষে লালন আপনিতেই পরিচয় দিতে চাননি, আমরাই বরং বারবার ধরনা দিয়েছি তাঁর কাছে। অথচ নিজ বর্ণ-পরিচয় বোঝাতে তিনি পদে পদে মূলত এক কথাই বলতে চেয়েছিলেন-  সবে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে। কারে বা কী বলি আমি দিশে না মেলে প্রথম লালন জীবনীকার বসন্ত কুমার পালও ‘মহাত্মা লালন’ নিবন্ধে সে রকমই বলেছেন- ‘সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।’ কিছু কিছু মুসলমান সাধক-ফকির অবশ্য আরেক রকম যুক্তি তোলেন। তাঁদের মতে, আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন বলেই লালন তাঁর গানে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ফকির লালন, অধম লালন, দরবেশ কিংবা সাঁই লালন ইত্যাদি উপাধি যোগ করেছিলেন। তবে হিন্দু সাধকরা ফকির পদের পাশাপাশি সাঁই-গোসাই ইত্যাদি পদেও তাঁকে ডেকে থাকেন। জাত উদ্ধারে যত তর্কই থাকুক না কেন, জাতবিষয়ক গানগুলো বিচার করলে যে বিষয়টি পরিষ্কার হতে থাকে তা হলো, লালন সচেতনভাবেই জাত-বর্ণ গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁর সহধর্মিণী বিশখা কিংবা পরিচিতজনরাও কেউ তাঁর প্রকৃত পরিচয় দিতে পারেননি। যিনি জাতের আগল ভাঙতে এসেছেন, তিনি তো লুকিয়েই রাখতে চাইবেন তাঁর জাত-কুল, লোকপরিচয়। গবেষকরাও হন্যে হয়ে অগত্যা বিবিধ মত-দ্বিমত দিয়েছেন। ফলে অচিন গাঁয়ের অচেনা লালন আমাদের কাছে আজও রহস্যময় এক সাধক পুরুষের নাম। সমকালের হাততালি, হর্ষধ্বনি কিংবা বাহবা পেতে কাঙালের মতো হাত পেতে থাকেননি তিনি; বরং মনের আনন্দে গান ধরেছেন। সম্ভবত সে কারণেই তিনি গতানুগতিক পার্থিব মোহমুক্তি লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর মতো করে জীবনের গভীর কথা সহজভাবে আর কেউ এ বাংলায় বলতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আজ অবধি প্রাজ্ঞজনরা তাই বুঝি বারবার আবিষ্ট হচ্ছেন লালনে।

 

লালন কী বিশ্বাস করতেন, কী তাঁর ধর্মমত, জীবনপ্রণালী- সব কিছুই তাঁর গানের অন্তর্গত দিব্যকথার মধ্যে বিরাজ করে। খাঁচার ভিতর অচিনপাখি কেমনে আসে যায় আমি একদিনও না দেখিলাম তারে। লালন মুখে মুখেই পদ রচনা করতেন। মনে নতুন গান উদয় হলে শিষ্যদের ডেকে বলতেন-  ‘পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে।’ তারপর গেয়ে শোনাতেন। ফকির মানিক ও মনিরুদ্দিন শাহ্ বাঁধা গান লিখে নিতেন। লিখতে গেলে তিনি হৈ হৈ করে উঠতেন- ‘লিখিস না, ছিনায় রাখ্। এসব গান লোকে জানলে সারা বিশ্বে হৈচৈ হবে। কেউ বুঝবে কেউ বুঝবে না।’ মনিরুদ্দিন শাহ্ লিখে রাখতেন। মনিরুদ্দিন নিজ হাতে কয়টা গানের খাতা লিখেছিলেন তার বিস্তারিত তথ্য সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে বছর পাঁচেক আগে একটি খাতা কারিকরপাড়ার ফকির আনোয়ার হোসেন ওরফে মন্টু শাহের বাড়িতে পেয়েছিলাম। অরিজিনাল খাতাটিতে পর পর ৫৯৭টি গান আছে। মনিরুদ্দিনের হাতের লেখা পরিচ্ছন্ন। এত বড় খাতায় কোথাও তেমন কাটাকুটি হয়নি। পাণ্ডুলিপির শেষভাগে আদ্যক্ষরের বরাতে সাজানো আছে ঝকঝকে সূচিপত্র। কিছু পাতায় অবশ্য উঁই লেগেছিল; কিন্তু মন্টু খুব যত্ন করে পুরো খাতার পাতাগুলোকে লেমিনেটিং করে নিয়েছেন। খাতা দেখাতে দেখাতে মন্টু একটু হতাশ হন। তারপর বলেন, ‘খাতাটা সরকারে চাইলে কোনো যাদুঘরে দিয়ে দেব। আমি মারা গেলে তো এই খাতাও এক সময় হারাইয়া যাবে।’ মন্টু শাহের আশঙ্কাই ঠিক হলো। বছর দুয়েক আগে মন্টু শাহ দেহত্যাগ করেছেন। জানি না খাতাটা এখন কার হেফাজতে আছে। হাতখাতাটা যে লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হ্যান্ডনোটের আদলে লেখা অরিজিনাল এ পাণ্ডুলিপিটি বাঁচিয়ে রাখতে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শিষ্যদের ধারণা, গানের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। প্রকৃতপক্ষে এত বিপুল সংখ্যক গান পাওয়া যায় না। শোনা যায়, কোনো কোনো শিষ্যের মৃত্যুর পর অছিয়ত মোতাবেক গানের খাতা তাঁদের কবরে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। শুধু কী তাই! সমসময়ে অনেক ভক্তই গানের খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি। সে যাই হোক, ব্যক্তি লালনকে খুঁজতে অগত্যা গানের কাছেই যেতে হয়। গানের মধ্যেই পুরোমাত্রায় বিদ্যমান থাকেন তিনি। সাধুদের কাছে লালনগান তাই শুধুই গান নয়, বরং গান হলো জ্ঞান; তাঁদের সাধনসংগীত। গানগত পদ-পদাবলিকে তাঁরা কালামতুল্য ভাবেন। সে কারণে সুরের চেয়ে পদাবলির অন্তর্জালে বিরাজিত সার কথাই বাউল সাধনার পরম বস্তু। বাউলরা কেবল গানের আধ্যাত্মিক মানে নিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না বরং গানের দেহকেন্দ্রিক নির্দেশনা জেনে গুহ্য সাধনাও করেন। অনেকেই মনে করেন, প্রত্যেক লালন গানে আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, জৈবিক- এই তিন ধরনের ব্যাখ্যা থাকে। গান প্রতি তিন রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে কি না তা জানতে বিস্তারিত গবেষণা ও মতামত প্রয়োজন হবে। তবে এ পর্যন্ত সংগৃহীত ৭০০-৮০০ গানকে ক্রমাগত অনুধাবন করতে গেলে বেশ কিছু গানে, বিশেষ করে ত্রিবেণীতত্ত্বের গানগুলোতে দুটো ধারা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে; যার মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক ও অপরটি জৈবিকভাবের। সহজ করে বলতে গেলে প্রত্যেক গানের ব্যাখ্যা বর্ণনার ভেতরেই কম-বেশি আধ্যাত্মিক এবং জৈবিক বা মিথুনাত্মক নির্দেশনা আছে। লালনের সবচেয়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয় একটি গানের কথাই ধরা যাক- মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের সনে। কে এই মনের মানুষ? ‘মনের মানুষ’ নিয়ে কয়েক রকমের ব্যাখ্যা আছে। উঠতি বয়সের বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী ‘মনের মানুষ’ বলতে প্রেমিক-প্রেমিকার যুগল মিলন বোঝে। আধ্যাত্মিকভাবে যে ব্যাখ্যাটি অনিবার্য হয়ে ওঠে তা হলো, স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির মিলন। অধিকাংশ প্রাজ্ঞ লালনভক্ত মূলত তাই মনে করেন। কিন্তু সাধনলাইনে সাধু-ফকিরদের কাছে ‘মনের মানুষ’ অন্য জিনিস। সাধুরা মনের মানুষ বলতে যা বোঝান, তা দেহকেন্দ্রিক, নারীর ঋতুকালের সঙ্গে এর যথেষ্টই যোগ আছে। এই মনের মানুষকে লালন নানা জায়গায় বিভিন্ন রূপকে ক্ষণে ক্ষণে উপস্থাপন করেছেন। যেমন সহজ মানুষ, অধরচাঁদ, রসের মানুষ, ভাবের মানুষ, অটল মানুষ, অচিন পাখি, অজানা মানুষ ইত্যাদি। সবই আসলে লালনের ‘মনের মানুষ’ বটে; একেক জায়গায় একেকভাবে এসেছে। রূপক এসব মনের মানুষের যেমন আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে, তেমনই মিথুনাত্মক ব্যাখ্যাও আছে। যারা রসপন্থী তাঁরাই নেহাজ করে মনের মানুষকে ধরতে পারেন। ত্রিবেণীর ধারা বুঝে, মর্ম জেনে অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে ধরার জন্য। আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে/সে কি সামান্য চোরা ধরবি কোনা-কানচিতে। কে এই চোর? যাকে হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে ধরতে হয়। সে তো সামান্য চোরা নয়, সে থাকে কোনা-কানচিতে। অনেকেই হাওয়ার ঘর বলতে বুকের খাঁচা মনে করেন এবং চোর বলতে মনচোরা অর্থাৎ আত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে বুঝে থাকেন। কিন্তু সাধনার ভাষায় চোরের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অন্য রকম। চোর মানে সেই- যে মনের মানুষ- যাকে ধরার জন্য সাধু আকাঙ্ক্ষা করেন। মনের মানুষের মতোই চোর মীনরূপে দেহেই বিদ্যমান থাকে। অস্থি চর্ম স্বর্ণরূপ তাতে মহারসের কূপ বেগে ঢেউ খেলে ও তার এক বিন্দু অপার সিন্ধু হয়রে ভূমণ্ডলে লালনের জীবনাচার, তত্ত্বগানের বহুমাত্রিক মনোভাব ও গুহ্য বিষয়বৃত্তান্ত স্বাভাবিকভাবে আমাদের কাছে তাঁকে আরো রহস্যময় করে তোলে। সে যাই হোক, সাধনজগতের এসব গোপনীয় বিষয় বাউলদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ। ফলে এই যে অনেকখানি গুহ্য এবং না বলা গোপনীয় ব্যাপার বিদ্যমান, তা কেবল এই গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বয়ে যেতে থাকে। বিশেষ গোপনীয়তার কারণে ইঙ্গিতবাহী এসব আলোচনাও কেবল বাউলদের সঙ্গেই করা যায়। যেখানে অন্যদের প্রবেশাধিকার থাকে না বললেই চলে। লালনের ধর্মটা যেহেতু গুরুবাদী, সে কারণে ভাবশিষ্যদের জীবনাচার বাউল ধর্মের অনেকখানি মৌলিক বিষয়।

 

১২৩ বছর আগে দেহত্যাগী লালনের একজোড়া গুরু-শিষ্যকে ধরে নেমে আসলেই এখনো জীবিত বাউলের দেখা মেলে। গুরু-শিষ্যের সরেজমিন কথোপকথন, জীবন, যৌনাচার- সব কিছুর বিশ্লেষণ করলেই কেবল পাওয়া যেতে পারে সম্যক লালন ও তাঁর দর্শনকে। কিন্তু ক্রমেই তৃতীয় সিঁড়ির শিষ্যদের সংখ্যা কমে আসছে। তা ছাড়া যুগের আধুনিক হাওয়া এসে লাগতে শুরু করেছে এ প্রজন্মের বাউলদের গায়ে। গ্রাম্য বাউলকে শহরে এনে বাণিজ্যিকীকরণও চলছে সমান তালে। একতারা, মালা, বালা, খিলকা- এসবের সঙ্গে যোগ হচ্ছে প্যান্ট-শার্টের মতো আধুনিক লেবাস। ঘটিবাটি-করঙ্গের পরিবর্তে তরুণ বাউলদের সঙ্গী এখন মোবাইল ফোন। জনপ্রিয়তার নামে সাধক-বাউলের চেয়ে বাড়ছে শিল্পী-বাউলের সংখ্যা। ‘আমি কে’ তা চেনার চেয়ে ‘আমি কে’ তা দেখানোর একটা প্রতিযোগিতা যেন নীরবেই এগিয়ে আসছে বাউলদের সামনে। আকাশ-সংস্কৃতির বাহুল্যতায় ইদানীং আদি সুর-লয়ের তোয়াক্কা না করেই নানা সুরে ও মিশ্রণে গাওয়া হচ্ছে লালন গান। ফলে মূল সুর থেকে আমরা যেমন সরে যাচ্ছি, তেমনি হারাতে বসেছি আমাদের বাউল সংস্কৃতি ও সাহিত্য। বাউলভূমি কুষ্টিয়া-মেহেরপুরসহ সারা দেশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুরনো বাউল, যাঁরা আজও আদি সুরে গেয়ে চলেছেন লালন গান। নিভৃতচারী এসব বাউলের সহায়তায় লালন গানের একটা স্বতন্ত্র স্বরলিপি তৈরি করা দরকার। পুরনো বাউলরা বেঁচে থাকতে থাকতেই জানতে হবে সাধনমার্গের আদ্যকথা। তবেই একদিকে যেমন বাউলসংগীতকে বাঁচানো যাবে তার দুর্দশা থেকে; তেমনি জানা যাবে লালন ও তাঁর সম্যক দর্শনকে।

 

লালনের জন্মভূমির চেয়ে গানই অধিক সত্য। তাঁর মৃত্যুর পর ‘হিতকরী’ পত্রিকা অসহায়ভাবে লিখেছিল- ‘ইঁহার জীবনী লিখিবার কোনো উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছুই বলিতেন না। শিষ্যেরা হয়তো তাহার নিষেধক্রমে না হয় অজ্ঞাতবশত কিছুই বলিতে পারে না।’ লালনের পরিচয় সঠিকভাবে বলতে গেলে ‘হয়তো’ শব্দটি যোগ করতেই হয়। কিছুটা সত্য কিছুটা কল্পনা আর কিছুটা অতিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে বিষয়টি মিথ নয়, বানানো কোনো গল্পও নয়। কথিত আছে, ১১৭৯ (১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ) বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক ঝিনাইদহ জেলার হরিশপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। আবার বলা হয়, কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর ভাঁড়রা গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘কাঙাল (কাঙাল হরিনাথ) তাঁকে জানতেন, মীর মশাররফ চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক জলধর সেন বা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাঁকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেননি লালনের জাতপরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম।’

 

লালন কী জাত সংসারে জাত-পাত মানতেন না লালন। যদিও শিক্ষিত ছিলেন না, লেখাপড়া জানতেন না, তথাপি হৃদয়জ্ঞান ছিল প্রখর। আর এ জন্যই শিক্ষা-দীক্ষায় পাস না দিয়েও তিনি ছিলেন পণ্ডিত। শাস্ত্র না পড়লেও ধর্মালাপে বেশ পারঙ্গম ছিলেন। তবে তিনি যে কোনো ধর্ম মানতেন না তার প্রমাণ মেলে ‘হিতকরী’ পত্রিকা থেকে- ‘লালন নিজে কোনো সাম্প্রদায়িক ধর্মাবলম্বী ছিলেন না; অথচ সব ধর্মের লোকেই তাঁকে আপন বলিয়া জানিত। মুসলমানদিগের সহিত তাঁহার আচার-ব্যবহার থাকায় অনেকে তাঁহাকে মুসলমান মনে করিত; বৈষ্ণব ধর্মের মত পোষণ করিতে দেখিয়া হিন্দুরা ইঁহাকে বৈষ্ণব ঠাওরাইত। জাতিভেদ মানিতেন না, নিরাকার পরমেশ্বর বিশ্বাস দেখিয়া ব্রাহ্মদিগের মনে ইঁহাকে ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী বলিয়া ভ্রম হওয়া আশ্চর্য নহে; কিন্তু ইঁহাকে ব্রাহ্ম বলিবার উপায় নাই। … ইনি নোমাজ করিতেন না। সুতরাং মুসলমান কি প্রকারে বলা যায়?’ আর লালন তো একবাক্যে বলেই গেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।’

লালন, মহাত্মা লালন

 

লালনের নকল প্রতিকৃতিটিই বিখ্যাত। কেমন ছিলেন দেখতে? আমরা যে ছবিটা দেখি এটাই কি লালনের প্রকৃত অবয়ব? এই ছবিটা বেশ বিখ্যাতও। এঁকেছেন নন্দলাল বসু। ১৯১৬ সালে তিনি এঁকেছিলেন ছবিটা। অথচ লালন মারা গেছেন ১৮৯০ সালে। নন্দলাল ছবিটা এঁকেছিলেন কল্পনা মিশিয়ে। তাঁর সঙ্গে লালনের দেখা হওয়ার বিষয়টি ভাবনাতীত। কারণ নন্দলাল বসু জন্মেছিলেন খড়গপুরে। সেটা ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে। এরপর আট বছর কাল-অবধি যদিও লালন বেঁচেছিলেন, কিন্তু বঙ্গবাসী এক গায়কের সঙ্গে খড়গপুরের আট বছর বয়সী এক কিশোরের দেখা হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি ছিল না। তাই নন্দলালের ছবিটা নেহাতই কাল্পনিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা ছবি ঠিকই বেঁচে যায়। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগের ঘটনা সেটা। ঘটনাটা ঘটেছিল শিলাইদহ জমিদারদের হাউসবোটে। ১৮৮৯ সালের ৫ মে। লাঠি ঠুকতে ঠুকতে লালন গিয়ে হাজির হন হাউসবোটে। তখন তিনি বয়সের ভারে একজন ঝুঁকে পড়া মানুষ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁকে বসিয়ে দেন দামি একটা চেয়ারে। এভাবেই ন্যুব্জ লালনের একটা ছবি পেয়ে যাই আমরা। এটাই লালনের প্রকৃত প্রতিকৃতি, যদিও একটি সাধারণ স্কেচমাত্র। এটিও বা কম কিসে! এ ছাড়া বাদবাকি প্রতিকৃতি কল্পনা দিয়ে রং মাখানো।

 

 

কাঙাল হরিনাথ লালনের চেয়ে বয়সে ছিলেন ছোট। তবে হৃদ্যতা ছিল অসম্ভব। লালনের গান প্রচারে ছিল তাঁর বিশেষ ভূমিকা। একবার হরিনাথ লালনকে তাঁর কিছু গান দেখিয়ে বললেন, ‘ভাই, আমার এ কথাগুলো তোমার কেমন লাগল?’ লালন হেসে উত্তর দিলেন, ‘তোমার এ ব্যঞ্জন বেশ হয়েছে, তবে নুনে কিছু কম আছে।’ এ ছাড়া মীর মশাররফ হোসেন, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, জলধর সেনের সঙ্গেও লালনের সম্পর্ক ছিল।

 

রবীন্দ্রনাথ ও লালন সম্ভবত লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়নি। তবে সভ্য সমাজে লালনকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ। লালনের একটি গানে বেশ মোহিত হয়েছিলেন তিনি, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি/কমনে আসে যায়।/ধরতে পারলে মনো-বেড়ি/দিতাম পাখির পায়।’ দেহতত্ত্বের এ গানটিকে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি অনুবাদও করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন গানের মর্মার্থ বোঝাতে। আর সে কারণেই বুঝি ১৯২৫ সালের ভারতীয় দর্শন মহাসভায় ইংরেজি বক্তৃতায় এই গানের উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, অচিন পাখি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কত সহজে মরমি অনুভব পৌঁছে দিয়েছিলেন লালন। লালনের সঙ্গে দেখা না হলেও লালন-অনুসারীদের সঙ্গে দেখা হয়েছে রবিবাবুর। এক চিঠির মধ্যে পাওয়া যায় সেই কথা, ‘তুমি তো দেখেছ শিলাইদহতে লালন শাহ ফকিরের শিষ্যদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার কিরূপ আলাপ জমত। তারা গরিব। পোশাক-পরিচ্ছদ নাই। দেখলে বোঝার জো নাই তারা কত মহৎ। কিন্তু কত গভীর বিষয় সহজভাবে তারা বলতে পারত।’ শুধু কি তাই! লালনের মৃত্যুর পর তাঁর গানের খাতাও সংগ্রহ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লালনগীতি সংগ্রাহক একজনকে লালনশিষ্য ভোলাই শা বলেছিলেন- ‘দেখুন, রবিঠাকুর আমার গুরুর গান খুব ভালোবাসতেন, আমাদের খাতা তিনি নিয়ে গেছেন।’ সেই খাতা গত শতকের শেষার্ধে পাওয়া যায় এবং প্রকাশিত হয়।

 

কাঙাল হরিনাথের ‘শখের বাউল’ ১৮৮০ সালের কথা। তখন গ্রীষ্মকাল। কাঙাল হরিনাথের জীবনে এক অভাবনীয় মুহূর্ত ছিল সেটা। তিনি লালনের গান শুনে মোহিত হয়ে পড়লেন। ভাবলেন নিজেও একটা বাউল গানের দল গড়বেন। তাঁর গ্রামবার্তা-প্রেসে কাজ করার সময় পাশে পেলেন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও জলধর সেনকে। ব্যস, জমে গেল সাঙ্গ। পাশে পণ্ডিত প্রসন্ন কুমার বললেন, ‘নতুন করে গান তৈরি করতে হবে।’ শুরু হলো কাজ। সে এক অপার্থিব দৃশ্য ছিল বটে। নকল বাউল গানের দল। গানের সঙ্গে ছিল নৃত্য। জলধর সেন সেই বর্ণনা দিয়েছিলেন চমৎকার করে, ‘দেখিতেছি একদল ফকির; সকলেরই আলখাল্লা পরা, কাহারও মুখে কৃত্রিম দাড়ি, কাহারও মাথায় কৃত্রিম বাবরি চুল, সকলেরই নগ্ন পদ।’ এই দল দেখেছিলেন প্রাণকৃষ্ণ অধিকারী। তাঁর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, ‘খেলকা, চুল, দাড়ি, টুপি ব্যবহার এবং কাহার কাহার পায়ে নূপুরও থাকিত। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ডুগি, খোমকা, খুঞ্জুরি, একতারা প্রভৃতি ফকিরের সাজে তাহারা বাহির হইত। ফিকিরচাঁদ ফকিরের দল দেখিয়া শেষে গ্রামে গ্রামে অনেক দল সৃষ্টি হইল।’ তবে এ কথা কিন্তু সত্যি লালন যা পারেননি, সেই কাজ করতে পেরেছিলেন তাঁরা। তাঁরা গানকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাংলার বিস্তৃত সীমানায়। লালনের গান চারদিকে যতটা ছড়িয়েছিল তার চেয়ে বেশি ছড়িয়েছিল নকল বাউলদের গান। অথচ লালনকে দেখে, তাঁর গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়েই দল গড়েছিলেন কাঙাল হরিনাথ।

 

যে জীবন সংগীতের মরমি সাধক হলেও লালন ছিলেন যুক্তিবাদী। আর তিনি ছিলেন বেশ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। যার ফলে বাহ্যিক ব্যাপার ছাড়িয়ে যেত তাঁর ভাবনা। আর তারই প্রকাশ গানে। লালন মূলত গানের মধ্য দিয়ে করে গেছেন মানবসাধনা। যেমন- ‘কেউ মালা কেউ তসবি গলায়/তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়- /যাওয়া কিংবা আসার বেলায়/জাতের চিহ্ন রয় কার রে।’ সারা জীবন তিনি শুধু সংগীত সাধনাই করে গেছেন। আর এ কারণে গান্ধীরও ২৫ বছর আগে তিনি পেয়েছিলেন ‘মহাত্মা’ উপাধি। পাক্ষিক হিতকরীতে তাঁর মৃত্যুর পর ছাপা হয়, ‘লালন ফকিরের নাম এ অঞ্চলে কাহারও শুনিতে বাকি নাই। শুধু এ অঞ্চলে কেন, পূর্বে চট্টগ্রাম, উত্তরে রংপুর, দক্ষিণে যশোহর এবং পশ্চিমে অনেকদূর পর্যন্ত বঙ্গদেশের ভিন্ন দুই স্থানে বহুসংখ্যক লোক এই লালন ফকিরের শিষ্য; শুনিতে পাই ইহার শিষ্য ১০ হাজারের ওপর। ইঁহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি; আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি। … ইনি ১১৬ বছর বয়সে গত ১৭ অক্টোবর শুক্রবার প্রাতে মানবলীলা সংবরণ করিয়াছেন। … মরণের পূর্ব রাতেও প্রায় সব সময় গান করিয়া ৫টার সময় শিষ্যদের বলেন, আমি চলিলাম। ইহার কিয়ৎকাল পরে শ্বাসরোধ হয়।’

ছেঁউড়িয়া ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় বসেই লালন সাধন ও সংগীতচর্চা করতেন। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৭ অক্টোবর, ১৮৯০) এখানেই তিনি পরলোকগমন করেন। প্রতিবছর দোল পূর্ণিমা (মার্চ-এপ্রিল) ও মৃত্যুবার্ষিকীতে ভক্তরা তাঁর মাজারে সমবেত হন। চলে সাধুসেবা ও সংগীত। এখন লালনের মাজারটিতে আর ঘর নেই। সেখানে রাষ্ট্রীয় অনুদানে হয়েছে দালান। কে জানে ইট-পাথরে অধুনা বাউলমন কতটা আটকায়!

 

মাতিনুর রহমান রসি | ঢাকা।

2017-06-03T22:22:55+00:00 Tags: , |